শতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার, কালীপুজোর মণ্ডপে স্মৃতির আবহে দুর্গা মাতা সংঘ
আলোর উৎসবে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য, হাটুদেওয়ানে নজরকাড়া থিম দুর্গা মাতা সংঘেরনিজস্ব সংবাদদাতা, বর্ধমান: দীপাবলির আলোকমালায় সেজে উঠেছে হাটুদেওয়ান। শ্যামার আরাধনার আবহে এবার বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করার অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে বর্ধমানের হাটুদেওয়ানের দুর্গা মাতা সংঘ। বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে তাদের এবারের কালীপুজোর বিশেষ থিমশতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার।১৮তম বর্ষে আমরা মহানায়ক এর রুপে।শতবর্ষে প্রনাম জানাই অ্যন্টনি ফিরিঙ্গি কে।।ঐতিহ্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্রের নস্টালজিয়া এবং বাঙালির আবেগকে একসূত্রে গেঁথে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ ভাবনা। ৭ নভেম্বর ২০২৬, শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুজোর শুভ উদ্বোধন হয়।১৯২৬ থেকে ২০২৬একশো বছরের ব্যবধানে সময়ের ক্যালেন্ডারে বদল এসেছে অনেক। কিন্তু উত্তমকুমারের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় তাঁর অনন্য উপস্থিতির আবেদন আজও অমলিন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই দুর্গা মাতা সংঘের এই বিশেষ আয়োজন। মহানায়কের জন্মশতবর্ষে তাঁকে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর এই প্রয়াস নিছক পুজোর থিমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক নিবেদন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালবিকা খাটুয়া (PD, DRDC ও Additional District Mission Director, DMMU, Purba Bardhaman), অনির্বাণ রায় (DPRDO, Purba Bardhaman), বাজেপ্রতাপপুর রামকৃষ্ণ মঠের মহারাজ এবং বিশিষ্ট সমাজসেবী অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের উপস্থিতিতে পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।দুর্গা মাতা সংঘের ২০০৮ সালে পথচলা শুরু। ২০২৬ সালে ১৮ বছরে পদার্পণ করেছে এই পুজো কমিটি। আঠারো বছরের এই যাত্রাপথে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচিতি গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতি বছর নতুন ভাবনা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে চলেছেন উদ্যোক্তারা। এবারের শতবর্ষের মহানায়ক ভাবনা সেই প্রচেষ্টায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।পুজো কমিটির সম্পাদক শৈলেন্দ্রনাথ দাস জানান, স্থানীয় এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষের সমাগম হয় এই পুজোকে কেন্দ্র করে। তাঁর কথায়, পুজোর চার দিন ধরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ প্রতিমা ও মণ্ডপ দর্শনে আসেন। দর্শনার্থীদের এই বিপুল উপস্থিতি পুজো কমিটির সদস্যদের উৎসাহিত করে।বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. কুনাল চক্রবর্তী এবারের উদ্যোগের পিছনে থাকা পরিশ্রম ও আন্তরিকতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, পাড়ার মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের মাত্র কয়েক দিনের অক্লান্ত প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলেই এমন একটি অসাধারণ থিমের আয়োজন সম্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে মানুষ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সামাজিক মাধ্যমের জগতে ক্রমশ বেশি সময় কাটাচ্ছেন, তখন বাস্তব জীবনের শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা ও কৃত্রিমতার এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার এক গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করার এই উদ্যোগ বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মহানায়ক উত্তমকুমারের জীবন, অভিনয় এবং চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর অবদানকে নতুন করে জানার সুযোগ তৈরি করছে এই পুজোর ভাবনা।ক্লাবের কালচারাল সম্পাদক তারকনাথ মুখোপাধ্যায় জনতার কথা কে জানান, সামান্য কয়েকটি পরিবার মিলে এত বড় কর্মকান্ড করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ, কিন্তু সকলে আমরা একসাথে ঝাঁপিয়ে পরে সমান ভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নিই। তিনি জানান এবছর মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্ম শতবর্ষ। শতবর্ষ অতিক্রম করেও বাঙালি আজও তাঁদের ম্যাটিনি আইডল কে ভুলতে পারেনি। তিনি আজও এই প্রজন্মের কাছেও প্রাসঙ্গিক নায়ক। তাঁর অভিনীত ছবির ওপর-ই আধারিত আমাদের এই বছরের থিম। এবারের থিম নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন সুব্রত বৈরাগী। থিমের মূল ভাবনা ও পরিকল্পনায় রয়েছেন সৌম্য দাস এবং তারকনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁদের পরিকল্পনা ও শিল্পসৃষ্টির সমন্বয়ে মহানায়ককে ঘিরে তৈরি হয়েছে এবারের বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহ।পুজোর নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে পুজোর্চনা ও হোমযজ্ঞ। ৯ নভেম্বর ভোগ বিতরণ, ১০ নভেম্বর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ১১ নভেম্বর প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে এবারের উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।দীপাবলির আলোয় যখন চারদিক ঝলমল করছে, তখন হাটুদেওয়ানের দুর্গা মাতা সংঘের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দিচ্ছেউৎসব কেবল আলোকসজ্জা, প্রতিমা কিংবা মণ্ডপের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎসবের মধ্য দিয়েও বাঁচিয়ে রাখা যায় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁকে ঘিরে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য তাই বাঙালির চলচ্চিত্রপ্রেম ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রকাশ।মহানায়ক তোমারে সেলাম।

